আমি দাড়িভিট থেকে ভাষা শহীদ বলছি !

আমি দাড়িভিট থেকে ভাষা শহীদ বলছি ?

I am speaking a language martyr from DARIVIT

জাগো বাঙালি জাগাও বাংলা
বাংলা ভাষার জন্য আমার প্রাণ যাবে কি বৃথা ?

           আমি আপনাদের থেকে নিতান্তই ছোট কিন্তু, আমার মনে হয় ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ এর সেই দিনের কথা কিছু বলতে। আপনার অনেক জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি সবই বোঝেন। কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না। সেই দিন অর্থাৎ ২০ সেপ্টেম্বর 2018 তে সকালবেলায় তখন দশটা বাজে আমার বোন স্কুলে গেছিল। আমি দোকানের কাছেই ছিলাম, হঠাৎ করে স্কুল থেকে শুনতে পেলাম হৈ হট্টগোল, কিছু একটা গন্ডগোল হচ্ছে কিন্তু কি হচ্ছে বুঝতে পারছিলাম না। দৌড়ে গেলাম স্কুলের কাছে দেখলাম আমার বোনকে এবং তার সঙ্গে স্কুলের বহু ছাত্রছাত্রীকে পুলিশ টানাহেঁচড়া করছে কি হলো বিষয়টা ততক্ষণে মাথায় আসেনি আমার। ভিড়ের মাঝে শুনতে পাচ্ছি আমরা বাংলা ভাষার শিক্ষক চাই – আমরা বাংলা ভাষায় শিক্ষক চাই – আমরা কম্পিউটারের শিক্ষক চাই – আমরা ইতিহাসের শিক্ষক চাই – আমাদের উর্দু শিক্ষক চাইনা।

আমার বোনেরা এবং স্কুলের বিভিন্ন ছাত্রছাত্রীরা আমায় দেখে চিৎ

other of Martyr

কার করে যাচ্ছে দাদা দাদা আমায় বাঁচা পুলিশ আমাদেরকে মারছে,  তুই স্কুলে সামনে তুই আয়। এই দৃশ্য দেখে আমি ছুটে গেলাম সঙ্গে সঙ্গে , আমার বন্ধু তাপসও ছিল। আমি দেখলাম বোন তো আমার ন্যায্য দাবি করছে।  সে তো বাংলা ভাষায় শিক্ষা চাইছে। সে তো ভুল কিছু চাইছে না। আমি যে স্কুল থেকে পাশ করেছি আজ সেই স্কুলের এই অবস্থা। আজ পুলিশ ঢুকেছে ভাবতে পারছিনা। আমরা দুজনে ছুটে গেলাম ছাত্র-ছাত্রী এবং আমার বোনকে আঁকড়ে ধরে পুলিশ থেকে রক্ষা ছিলাম। এমন সময় আমাদের পাড়ার পুলিশ কাকুরা দেখতে পেলাম দুটো কি তিনটে দ্রুম দ্রুম করে বন্দুক থেকে কিছু একটা নিক্ষেপ করল। সে নিক্ষেপ করা বস্তুটির থেকে প্রচন্ড আকারে ধোঁয়া বের হতে লাগলো আমার এবং বিভিন্ন ছাত্র ছাত্রীর এবং বোনের চোখ জ্বলতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে আমাদের দাড়িভিট স্কুল চত্বর দৌড়াদৌড়ি হুড়োহু়িতে শুরু হয়ে গেল। আমি তখন বুঝতে পারছিলাম না আমি কি করবো ? সামান্য এক বাংলা ভাষার শিক্ষক চাইছি পশ্চিমবঙ্গের বুকে ! যেখানে অধিক সংখ্যক বাঙালিরা বাস করে, আমার বোন এবং ছাত্র ছাত্রীরা বাংলা ভাষায় পড়তে চাইছিল।  স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা সেই বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন করছিলো। এই সমস্ত কথা আমার মনে তখন ঘুরপাক করছিল কিন্তু হঠাৎ কিছু বুঝে উঠার আগেই সামনে থেকে দেখলাম পুলিশ ভ্যানের সামনের থেকে এক পুলিশ দাদা তাক করে গুলি ছোড়ে। সোজাসুজিভাবে একটি গুলি এসে আমার বুকে বিদ্ধ হয়। আমার চোখ কেমন যেন তখন অন্ধকার হয়ে আসছে। সেই চোখের বন্ধ হতে থাকা অবস্থাতে আমার এক সহযোগী বন্ধু  তার কোলে স্থান দেয়, ততক্ষন চোখ বন্ধ হয়ে এসেছে বোনের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। আমার বোন তখন দাদা দাদা করে কাঁদছিল চারিদিক থেকে শুনছিলাম গুলি ছুঁড়েছে পুলিশ – গুলি ছুঁড়েছে পুলিশ। আমার হাত-পা কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে। মুখে বলতে  চেয়েও কিছু বলতে পারছিনা। কেমন যেন অবশ হচ্ছে আস্তে আস্তে। শ্বাস নিতে  কষ্ট হচ্ছে । মনে পরল বের হবার আগে মকা ভাত বেরে দিয়ে ছিল , মনে হয় আমার মা  ভাত বেড়ে বসে ছিল। আমি আসবো মায়ের হাতে দুমুঠো ভাত খাব, কিন্তু মা আমার আর আসা হলনা, বাংলা ভাষার অধিকারের জন্য বোনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মা তোমার এই ছেলে এই ভাষার জন্য নিজেকে বলিদান দিয়েছে। আমার বাবা চাষি মানুষ, বাবা তখন মাঠে চাষ করছিল। ওই হট্টগোল এবং গুলির আওয়াজ পেয়ে বাবা ছুটে আসে। আমার রক্ত মাখা শরীর নিয়ে জাপ্টে ধরে বাবা হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকলো। আমি অবলা প্রাণীর মতো অনুভব করতে থাকলাম বাবার থাকলাম ভালবাসা । পরে দেখলাম আমার গ্রামের এই আরেক ভাই তাপস বর্মনের বুকে গুলি এবং বিপ্লবের পায়ে গুলি লেগেছে। ততক্ষণে গ্রামবাসীরা সিদ্ধান্ত নেন আমাকে এবং তাপসকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাবে । তাহারা রওনা দেন কিন্তু রাস্তায় কিছু দুষ্কৃতী পথ অবরুদ্ধ করে রাখে এবং আমাদের এই নিস্তেজ অবশ  শরীরটার উপরে বেধড়কভাবে মারধর শুরু করে। কিছুই বলতে পারছিলাম না তখন, প্রচন্ড ব্যথার উপর ব্যথা লাগছিল গ্রামবাসীর প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছে কিন্তু তারা অপরাগত হয়ে পরেছিল। কোন মতে সন্ধ্যাবেলা আমাকে এবং তাপস কে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছায় গ্রামবাসীরা। কিন্তু ততক্ষণে আমি আমার শরীর ছেড়ে বেরিয়ে এসে পরেছি। তার পরের দিন ভোরবেলা তাপস ও আমার কাছে চলে আসে।

আমাদের দাড়িভিট হাই স্কুল উত্তর দিনাজপুর জেলায় অবস্থিত। দাড়িভিট হাই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের দাবি ছিল বাংলা ও বিজ্ঞানের শিক্ষক চাই। কিন্তু সেখানে উর্দু শিক্ষক নিয়োগ করা হচ্ছে। বলা উল্লেখ্য স্কুলে কিন্তু উর্দুভাষী ছাত্রছাত্রী নেই। সেখানে বাংলা ও বিজ্ঞান শিক্ষকের স্থানে উর্দু এবং সংস্কৃত শিক্ষকের নিয়োগ করা হচ্ছিল। তা আমার বোন এবং স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা মেনে নিতে পারছিল না তাই তারা আন্দোলনে নেমেছিল। স্থানীয় মানুষের প্রতিবাদ জানিয়েছিল। কিন্তু সামান্য উত্তেজনা মুহূর্তে পুলিশ স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের তৎপরতায় নির্দেশে মনে হয় গুলি চালিয়ে দিলো তার ফল আমি রাজেশ সরকার এবং ভাই তাপস বর্মন এর এই দেহ ত্যাগ করতে হয়েছিল ! আমরা কিন্তু এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র।

             তারপর এই ঘটনার প্রতিবাদে সারা রাজ্য জুড়ে ব্যাপকভাবে প্রতিবাদ শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ হতে দেখা যায়। শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া বিশ্বের সব কয়টি মিডিয়াতে আমাদের উপরে অত্যাচার খবর প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিজেপি, বামপন্থী দল গুলো বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।  বিশেষ করে এবিভিপি জাতীয় পর্যায়ে বড় আন্দোলন করে।  কিন্তু এত কিছুর পরেও কি  বাংলা ভাষার জন্য আমাদের এই বলিদান ব্যর্থ হবেনা তো ? রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রলোভন ভয় দেখানো হয় আমাদের পরিবারকে। আমার রাজ্যের প্রিয় মুখ্যমন্ত্রী তিনি বাংলার মুখ, যিনি বাংলার মাতৃভাষা স্বীকৃতি প্রাপ্ত, সকলের মমতাময়ী মা,  তিনি আমার ঘরের কাছে এসেও, ঘরে যেতে সময় পেলেন না। বাংলা ভাষা না হোক দুটি ছেলের মৃত্যুতেও কি মমতাময়ী মার মমতা জাগল না ।  আমার মাকে বলা হয় সরকারের পক্ষ থেকে কি চাই বলুন ? একটাই জবাব দিয়েছিল আমাদের মা-বাবা আমাদের ছেলের বিচার চাই আমাদের সিবিআই তদন্ত চাই কিন্তু রাজ্য সরকার সিবিআই তদন্ত করতে একদম রাজি ছিলেন না । সরকারের বক্তব্য ছিল পুলিশ গুলি চালায়নি। চালিয়েছে আন্দোলনরত গ্রামবাসীরা অদ্ভুত যুক্তি যেখানে যেখানে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ভিডিও ফুটেজের দেখানো হয় পুলিশ স্পষ্টভাবে গুলি চালাচ্ছে তাও রাজ্য সরকার দেখেও না দেখার ভান করল। ও পুলিশ কাকু কি ভুল করেছিলাম আমরা বাংলা ভাষা পড়তে চেয়েছিলাম। তুমি গুলি চালিয়ে দেবে তাই ! পুলিশ কাকু তোমার সন্তানরা কি স্কুলে যাবে না ? ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি তাদের সাথে এমন না ঘটে। আমার মা রাজ্য সরকার এবং স্থানীয় বিধায়ক এবং পুলিশকে স্পষ্ট জানিয়েছে আমার ছেলের মৃত্যুর তদন্ত সিবিআই তদন্ত চাই। মা হাউ করে কেঁদে বলছিল “আমি মমতার বুক চিরে রক্ত খেতে চাই! এই মমতা কত মায়ের কোল খালি করে ছেলেকে বাপ হারা করেছে। কতো মাকে সন্তানহারা করেছে ! হিসাব নেই।” 

একটা কিছু ঘটার পরেও সরকার আমাদের মৃত্যুর তথ্য লোপাট করার চেষ্টা করেছে আমাদের মৃত্যুর সার্টিফিকেটে গুলিবিদ্ধ হওয়ার কোনো ঘটনা উল্লেখ করা হয়নি। আমাদের দাড়িভিট গ্রামে যুবক ছেলেদের কে রাতারাতি বিনা দোষে বিনা কারণে গ্রেফতার করে নিচ্ছিল। তাই গ্রামের বহু যুবক প্রায় মাসের পর মাস বাড়ির বাইরে থেকে ছিল। কিন্তু কই এতো আন্দোলন এত বিক্ষোভ হওয়া সত্ত্বেও সরকার তো দূরে থাক,  পশ্চিমবঙ্গের জনসাধারণের বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা জাগলোনা ! যদি সত্যিই জেগে উঠতো তাহলে আমাদের মৃত্যুর বিচার হতো। উর্দু ভাষার পরিবর্তে সরকার বাংলা ভাষাকে অধিক গুরুত্ব দিতে। সেদিনের ঘটনা দেখে মনে হচ্ছিল যেন আমি হিন্দুর দেশ ভারতবর্ষ পশ্চিমবঙ্গ প্রান্তে নেই। আছি পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশে, যেখানে উর্দু ভাষার প্রাধান্য বেশি।

            আমিতো নিমিষের জন্য ভুলেই গেছিলাম যে আমি বাংলা ভাষার স্থান বাংলার গৌরব স্থান পশ্চিমবঙ্গে আছি। কিন্তু আজও আমার আত্নবলিদান বিচার হলোনা। বাংলা ভাষার জন্য প্রাণের বলিদান এর আগেও অনেকে দিয়েছে বাংলাদেশেও দিয়েছে, কিন্তু সেখানে আজ আরবিযুক্ত বাংলা ভাষা হয়ে পরেছে। শিলচর ও প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু বাংলা ভাষাকে আজও বাঙালিরা সম্মান দিতে পারলো না। যদি পারত তাহলে আমাদের প্রাণ যেত না। একটাই অনুরোধ আপনাদের কাছে “ শুনছেন দাদা আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না” বলে গর্ববোধ করবেন না। আপনার মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ সম। শেষে বলবো

ওআমার বাংলা ভাষা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
বল বল বল সবে বাঙালি এবং বাংলা ভাষা একদিন ভারতবর্ষে শ্রেষ্ঠ আসন লবে।

আর হ্যাঁ দেখা পড়ে মাকে বোনকে  দাদাকে দিদিকে অবশ্যই বলবেন আপনার আত্মবিশ্বাসের ,“সাথে ছেলের বিচার অবশ্যই হবে, তাহার বলিদান ব্যর্থ যাবে না।”

আমরা আবার আসিব ফিরে এই বাংলা মায়ের কোলে।

জয় বঙ্গ জননী।

Bengali language movement in west bengal. urdu teacher in a bengali school, clash over appointment of urdu teacher, rajesh sarkar death, students death for teachers appointment, Martyred Rajesh Sarkar and Taposh Barman, Biplab Sarkar who has been wounded by bullets fired by police. High School in Islampur of Uttar Dinajpur West Bengal killed by police firing. They protesting against appointment of Urdu teacher in place of Bengali.

Leave a Comment