বাঙালির লোকসংস্কৃতি উৎসব চড়ক বা নীল পূজার ইতিহাস

চড়ক মেলা রচনা
charak puja of bengal

চড়ক পূজার ইতিহাস

চরক পূজা কেন করা হয় 

চড়ক পূজার ইতিহাস আধুনিকতার বেড়াজালে আজ বাঙালি হিন্দু নিজের লোকসংস্কৃতি উৎসব হারিয়ে ফেলতে চলেছে।  চরক বানীল পুজার  ইতিহাস বোলতে গেলে তেমনি একটি লোক সংস্কৃতি উৎসব গ্রাম বাংলাতে আজও দেখা যায়। বিশেষ করে উত্তর বঙ্গ, আসাম, দক্ষিণ বঙ্গের,  উত্তর 24 পরগনা দক্ষিণ 24 পরগনা, পুরুলিয়া ইত্যাদি অঞ্চলে এই উৎসবের প্রাধান্যতা দেখা যায়। একটু ভাল ভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে অঞ্চলগুলো মূলত কৃষিপ্রধান সেখানেই চড়কপূজা উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলার প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থার শরীরে প্রবেশ করতে হলে এরকম উৎসবগুলোকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করলেই কেবল লৌকিক বাংলার আদিরূপ দেখা সম্ভব হবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় একবার নীল পূজা কবে বা কখন কোথার থেকে শুরু হয়েছিল তা ইতিহাসে কোন কিছু পাওয়া যায়নি।  লিঙ্গপুরাণ, বৃহদ্ধর্মপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে চৈত্র মাসে শিবারাধনা প্রসঙ্গে নৃত্যগীতাদি উৎসবের উল্লেখ থাকলেও চড়ক পূজার উল্লেখ নেই
চড়ক মেলা রচনা

নীল পূজা পদ্ধতি বা চড়ক পূজার পদ্ধতি

মূলত এই পুজোতে শিব ঠাকুর কে পুজো করা হয় পূজারীদের দ্বারা শিব কে বলা হয় “বুড়ো শিব” । তার উপর আবার চরক বা নীল পূজা তে কোন রকম ব্রাহ্মণ এর প্রয়োজন হয় না। দেবাদিদেব মহাদেব স্বয়ং নিজের ভক্তদের পুজোতে সন্তুষ্ট হয়। যারা এই পুজোর ব্রত করেন তারা প্রায় একমাস যাবত সন্ন্যাস ব্রহ্মচারী রূপে থাকেন। তারপর চৈত্র শেষে  ধুমধাম ভাবে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। মূলত চরক পুজা দেখলে দেখা যায় এই পুজো ভূত প্রেত তন্ত্র মন্ত্র আদির উপর নির্ভর করে পুজো করা হয়। ব্যক্তিগতভাবে খুব অল্প বয়স থেকে আমি এই পুজো প্রত্যক্ষভাবে দেখে এসেছি আমার বাড়ির পাশে এই পুজো প্রতিবছরই অনুষ্ঠিত হতো এবং মেলাও লাগতো।

চড়ক পূজা কবে হয়

স্কুল থেকে ফিরে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় প্রায়ই দেখতাম গোটা চৈত্র মাস জুড়ে কিছু সন্ন্যাসী ছেলেপুলে (কারণ তারা এই শুধু চৈত্র মাসে তারা সন্ন্যাসী রূপে থাকেন) প্রচণ্ড দাবদাহে রোদ্দুরে মাথায় শিবের কি প্রতীকী এবং ত্রিশূল নিয়ে এবং কেউ বা গৌরী কেউ সেজে কেউবা নন্দী কেউবা দুর্গা সেজে নাচ গান করে, বলতে গেলে একপ্রকার যাত্রাপালা মতন করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বাড়ি বাড়ি গিয়ে করে এবং তারপর যেটুকু ভিক্ষা হিসাবে প্রাপ্ত করা করে তা দিয়েই পুজো এবং নিজেদের সন্ন্যাস জীবন-যাপন করে।চড়ক মেলা রচনা

চড়ক গাছ কি

চড়ক গাছ কি

চড়ক গাছ কি সেই সম্পর্কে বললে বলব চড়ক গাছ হল নিম গাছের কাঠকে পুজয়া করা হয়। আমি চৈত্র মাসের শেষে আগের রাত্রে দেখতাম পুকুর পাড়ে যে নিম কাঠ কে পুজো করা হয়, সেটিকে পুকুরপাড়ে বাজনা বাজাতে বাজাতে বাজাতে আহবান করা হয়, অদ্ভুতভাবে সেই নিম কাঠ ভেসে যেখানে বাজনা বাজিয়ে পুজো করে আহ্বান করা হচ্ছে সেখানে এসে উপস্থিত হয়। তাছাড়াও পূজার বাসন পত্র গুলি কেউ সেই পুকুরেই রাখা হয়। তারপর কার্তিকে পূজা অর্চনা করে সেখান থেকে মূল পুজো প্রাঙ্গন বারোয়ারি তলায় নিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। পরের দিন সকাল বেলা থেকেই শুরু হয়ে যায় হাজরা পূজা নীল পূজা চড়ক পূজার হাজরা নাচ । চড়ক গাছ ঘুরানো হয় । 

চড়ক পূজার হাজরা নাচ

charak puja hazra ধুমধাম পরিস্থিতি হয়, তারপর সেখানে দেখতে পেতাম বুড়ো শিবের পুজো দেখতাম কুমিরের পূজা, জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর হাঁটা, কাঁটা আর ছুঁড়ির ওপর লাফানো, বাণফোঁড়া, শিবের বিয়ে, অগ্নিনৃত্য, চড়কগাছে দোলা এবং দানো-বারানো বা হাজারা পূজা করা। দেবতার অবিচল ভক্তি ও নিষ্ঠা প্রদর্শনের জন্য তারা ধারালো বঁটি, গাছের কাঁটার উপর ঝাঁপ দেন কিংবা পা’দুটি উপরে মাথা নিচের দিকে রেখে ঝুলে থাকেন। এগুলি যথাক্রমে ‘বঁটি-ঝাঁপ’, ‘কাঁটা-ঝাপ’ ও ‘ঝুল-ঝাঁপ’ নামে পরিচিত। এখানে লোহার সরু শালকা  জিভে ঢুকিয়ে রাখে তার নাম  বাণ-সন্ন্যাস, তাছাড়া পিঠে পিছনে স্ট্রোক করে বেধে যে রাখে তার নাম বেত্র সন্ন্যাস, পিঠের পিছনে লোহার আংটা দ্বারা যাকে ঝুলিয়ে পুরো চক্রাকারে ঘোড়া হয় তার নাম বড়শি সন্ন্যাস।  সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি হয় এই পুজোতে। সকলকে বাঙালির এই লোকসংস্কৃতি উৎসব গুলি দেখা উচিত।

চড়ক পূজা কালী নাচ দেখুন

চড়ক পূজার মন্ত্র

চড়ক পুজার মন্ত্র লোক মুখে প্রচারিত। সাধারণত শিবের মন্ত্রকে চড়কতে মন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

চড়ক পূজার গান

আমরা দুজন ভাই শিবের গাজন গাই

বলদে চড়িয়া শিবে শিঙ্গায় দিলা হাঁক
আর শিঙ্গা শুনি মর্ত্যেতে বাজিয়া উঠল ঢাক
শিবের সনে কার্তিক গণেশ লক্ষ্মী সরস্বতী
আশ্বিন মাসে বাপের বাড়ি আসেন ভগবতী

চড়ক পূজার নাচ দেখুন

সবশেষে কথা বলব আধুনিকতার ছোঁয়া তে বাঙালি আজ বিকশিত হচ্ছে দিক-দিগন্তে ছুটে যাচ্ছে কিন্তু নিজের লোকসংস্কৃতি নিজের ব্যবহার নিজের আচরণ নিয়ম কানুন বাঙ্গালীকে ধরে রাখতে পেরেছে। আজ বাঙালি নিজের সংস্কৃতি নিয়ে বিভিন্ন কথা বলছে কিন্তু সংস্কৃতি চড়ক গাজন নীল পূজা এসব গ্রাম বাংলার বাঙালি সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাংলার ঐতিহ্য। আমরা চড়কের লোকগীতি টেলিভিশনের পর্দা তে শুনি ইউটিউব চ্যানেলের শুনি। কিন্তু গানের সৃষ্টি কেন হলো গানের সাথে জড়িয়ে আছে এক ইতিহাস বাঙালির নিজের সাংস্কৃতিক ইতিহাস।  তাহলে আমরা জানতে চেষ্টা করিনা এবং ভুলে যাই। শেষে বলব নিজের সংস্কৃতি নিজেকে ধরে রাখতে হবে,  ইংরেজীতে একটা কথা আছে “root less culture is born to die”.

একটি অনুরোধ পাঠকের প্রতি

কমেন্ট করবেন অবশ্যই ভালোলাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না। আমার ইউটুব চ্যানাল এবং  বাংলা অডিও বুক বা বাংলা পডকাস্ট সাবস্কাইব করুণ যাতে করে আপনি পড়ার সাথে শুনতে ও দেখতেও পারবেন। নিচে লিঙ্ক দিলাম ।

( All Subscription is Free)

For YouTube Subscribe – CLICK HERE

For Audio Book  Subscribe ( Please Click Following Logo or Name)

Bangla PODCAST

Google Audio Book –  Coming Soon

JIO Savan – Coming Soon

Bangla Audio Book – Coming Soon

Leave a Comment