ASSAM NRC- ডিটেনশন ক্যাম্পে দুলালচন্দ্র পাল মরিয়া প্রমাণ করিলেন তিনি মরেন নাই

অতিথি লেখক (Guest Blogging) Prof. Prasanta Chakraborty

ডিটেনশন ক্যাম্পে দুলালচন্দ্র পাল মরিয়া প্রমাণ করিলেন তিনি মরেন নাই

Table of Contents

Assam NRC in bengali dulal chandra paul was died in tezpur detention camp
Assam NRC Dulal Chandra Paul was died in Tezpur detention camp

ডিটেনশন ক্যাম্পে অকালমৃত্যুর দুলালচন্দ্র পাল

ডিটেনশন ক্যাম্পে ( detention camp ) অকালমৃত্যুর পর নয় দিন তাঁর দেহ মর্গে রক্ষিত ছিল। দুলালচন্দ্র পাল (Dulal Chandra Paul) । এই নামটি এই মুহূর্তে অসমে সর্বাধিক উচ্চারিত একটি নাম। দুলালবাবুর পুত্র-পরিবার দেহটি নিতে রাজি হয়নি। কারণ~”ডি” বা ডাউটফুল ( D VOTER ) অর্থাৎ সন্দেহজনক নাগরিকরূপে যদি তাঁকে তথাকথিত ক্যাম্পের নামে তিন বছর কারাবাসই করতে হয়েছিল~তাহলে তিনি ভারতীয় না বাংলাদেশী~সেটার মীমাংসা না-করে দেহ নেওয়া যায় কী করে?!! যদি তিনি “বাংলাদেশী”ই তাহলে তার মরদেহ বাংলাদেশ সরকার নিক। আর যদি তিনি “ভারতীয়”~তাহলে এই অকালমৃত্যু ও অত্যাচারের দায় ভারত সরকারকেই তো নিতে হবে।

মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন~এইরকম অবিচার সরকার চায় না

এইরকম একটি কঠিন দাবিতে অনড় থেকেছেন দুলালবাবুর পুত্র-পরিবার। বাঙালি সংগঠনের অনেক মানুষ তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। টনক নড়েছে সরকারেরও। শেষমেশ মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন~এইরকম অবিচার

Dulal Chandra Paul Assam
Dulal Chandra Paul

সরকার চায় না, সরকার মানবিক দৃষ্টিকোণ বহন করে ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং দুলালবাবুর শ্রাদ্ধে উপস্থিত থাকবেন বলেও কথা দিয়েছেন।
আজ অবশেষে দিন দশেক পর প্রয়াত দুলালবাবুর মরদেহ মর্গ থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। দাহ হবে।
আমি দুলালবাবুর পুত্র-পরিবারকে যুঝাড়ু মানসিকতার জন্য আন্তরিক অভিনন্দন ও স্বজন হারানোর জন্য সমবেদনা জানাই।
এই গোটা লড়াইয়ে অনুজপ্রতিম দীপক দে, রক্তিমাভ স্বামী সহ অনেকেই পাশে দাঁড়িয়েছেন। এঁদের সকলকে অশেষ ধন্যবাদ।

ডি ভোটার আর ডিটেনশন ক্যাম্প দেশভাগের বলি উদ্বাস্তুদের বা শরণার্থীদের জন্য হতেই পারে না

আমার স্পষ্ট অভিমত~দুই “ডি”~ডি ভোটার আর ডিটেনশন ক্যাম্প দেশভাগের বলি উদ্বাস্তুদের বা শরণার্থীদের জন্য হতেই পারে না। ইসলামি মৌলবাদীরা নিজেদের কল্পিত তথাকথিত ধর্মরাষ্ট্র বানিয়েছে~আর নেহরুর মতো কিছু রাজনৈতিক নেতা ক্ষমতার লোভে দেশকে কেটে তিন টুকরো করেছে। সেটার জন্য এই দেশের পাঁচ হাজার বছরের সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা ভুগবে কেন?! নিজের সভ্যতায় কেউ পরবাসী হতে পারে না। Assam NRC in bengali dulal chandra paul was died in tezpur detention camp

ডিটেনশন ক্যাম্প নিয়ে সবচেয়ে মূল্যবান ও প্রমাণ্য হৃদয়স্পর্শী বই লিখেছেন~”দৈনিক যুগশঙ্খ-র সম্পাদক অরিজিৎ আদিত্য। বইটির নাম~”ডি : রাষ্ট্রই যখন নিপীড়ক”।

বইটি পড়তে পড়তে চোখে জল আসে।
বর্তমান সরকার ভারতীয় সভ্যতার বিচারধারাজাত। অথচ ডিটেনশন ক্যাম্পে অনেক ভারতীয় নির্যাতিত হয়েছেন, হচ্ছেন। এরা অনুপ্রবেশকারী হতে পারেন না। এরা শরণার্থী। এই দুটো শব্দে প্রভেদ মানতেই হবে।

CAB এনে যদি শরণার্থীদের ওপর এই হয়রানি ও অবিচার বন্ধ হয়

বিচার ব্যবস্থার প্রতিও মানুষের আস্থা ক্রমশ নড়বড়ে হচ্ছে। আইন তো মানুষের জন্য। আইনের যথাযথ প্রয়োগ বাঞ্ছনীয়। CAB ( Citizenship (Amendment) Bill, 2016) এনে যদি শরণার্থীদের ওপর এই হয়রানি ও অবিচার বন্ধ হয়~তবেই CAB আনা উচিত। নইলে আলংকারিক আইন দিয়ে কী হবে!? ডিটেনশন ক্যাম্পের জন্য সরকারের প্রয়োজনে নতুন আইন আনা উচিত~অন্তত শরণার্থী আর অনুপ্রবেশকারীর দিকটি সুস্পষ্টভাবে রেখে।

ডিটেনশন ক্যাম্পের অমানবিক দিকটি নিয়ে অসমের জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোও চুপ। অনেকেই বলেছিলেন~৭১সনটি যদি কাট অফ হয়~তাহলে এর আগের বাঙালিদের ওপর জুলুম বন্ধ করার জন্য তাঁরা সরব হবেন। কই, দুলাল পালের মৃত্যুতে এঁরা দেখি চুপ…!

দুলাল পালের মরদেহ নয়দিন মর্গে ছিল। এরকম কোনো ঘটনা যদি কলকাতায় ঘটত~রাস্তায় মোমবাতি নিয়ে হাঁটতেন শঙ্খ ঘোষ থেকে জয় গোস্বামী~যাঁরা কারণে অকারণে রাস্তায় নেমে যান। আর কবি সুবোধের মতো গরুর ঠ্যাং রাস্তায় চিবিয়ে নৌটঙ্কিবাজ তো দেশ গেল দেশ রব তুলত। লাল বাঁদরদের লম্ফঝম্ফও তো দেখলাম না। নামটি “দুলাল পাল” না-হয়ে “দুখু মিঞা” যদি হতো~এরা নির্ঘাৎ দলে দলে ঝাঁপাত। এরা লুংগির তলায় চিরটাকাল প্রগতিশীলতা খোঁজে।

গুয়াহাটির বাঙালি সমাজের সমাজপতিরা যেমন ছিলেন তেমনই আছেন। ওই একইরকম নিস্পৃহ। উদাসীন। শৌখিন সাহিত্য শিল্পসংস্কৃতি করায় মত্ত। অসমিয়া সমাজের সচেতন মহলের একাংশের অভিযোগ~এখানকার বাঙালিরা সাতেও নেই পাঁচেও নেই। নিজেদের বঙ্গ-বঙ্গ জলতরঙ্গ কুঁয়োগুলোয় তাঁরা “নাদর ভেকুলি” বা কূপমণ্ডুকের মতো। অনেকটা ঘেঁটো। এই অভিযোগ আংশিক সমর্থন করি আমি। এই মাটিতে চারপাশে কী হচ্ছে~তা নিয়ে এদের কোনো মাথাব্যথাই নেই। আর ভুরাগাঁওতে বসে ডা. শান্তনু সান্যাল বা লংকায় বসে দীপক দে-রা নানা ক্ষেত্রে সরব। মহানাগরিক বঙ্গসন্তানেরা যে যার মতো নির্বিকল্প সমাধিতে মগ্ন।

এই গোটা চালচিত্রে নিজেকে মাঝে মাঝে খুব অসহায় লাগে। সরকারি চাকরি করি বলেই পায়ে নিয়মের শেকল। সার্ভিস রুলের বিরুদ্ধে যেতে পারি না। তাও যথাসম্ভব যতটুকু করার তা করার চেষ্টা করি।

দুলালবাবুর এই আত্মদান অন্তত একটা জনসচেতনতা তৈরি করেছে। বাহ্যত তাঁর মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু এই রাজ্যের বহু মানুষের মনে তিনি থেকে যাবেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষা নিয়ে বলা চলে~

“দুলালচন্দ্র পাল মরিয়া প্রমাণ করিলেন তিনি মরেন নাই।”

পড়ুন –

বাংলা ভাষার জন্য আমার বোনের রক্তে রাঙানো ‘অমর উনিশ’ ১৯মে আমি কি ভুলিতে পারি ?

আমি দাড়িভিট থেকে ভাষা শহীদ বলছি !

ভালো লাগলে সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে জানার সুযোগ করে দিন। এই ব্লগ সাইট টিতে আরো অনেক কিছু তথ্য এবং লেখা আছে পড়তে পারেন এবং ইমেইল সাবস্ক্রিপশন অপশন আছে যা একেবারে বিনামূল্যে আপনার ইমেইল এড্রেস দিয়ে সাবস্ক্রাইব করতে পারেন এবং আমার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে ইমেল করুন-  abdutta21@gmail.com

নিচে কমেন্ট বস্কে মতামত দিন

Prasanta Chakraborty Guwahati University

লেখক- ড. প্রশান্ত চক্রবর্তী
(লেখকএকজন সাহিত্যিক এবং সহযোগী  অধ্যাপক কটন বিশ্ববিদ্যালয়,গুয়াহাটি)
E-mail ID-
priyasakha_2009@rediffmail.com)

Leave a Comment